দ্বিতীয় অধ্যায়
সকাল থেকেই বুবা আমার সাথে কথা বলছে না,শরীরের দুর্বলতা আর আমার প্রতি অভিমান নিয়ে আজ ও একদম নিজের মধ্যে রয়েছে। ও হয়ত ভাবছে, আমি ওকে অবহেলা করছি কিন্তু আমি তো বলতেই পারছি না ডাক্তারের বলা কথা গুলো। যাই হোক আমি আজ আরও একজন ডাক্তারের কাছে বুবা কে নিয়ে গেলাম।
সব রিপোর্ট চেক করে আর বুবা কে দেখে ডাক্তার বাবু কিছু বলতে চাইলেন, এবার বুবা নিজেই আগ্রহর সাথে বলল হ্যাঁ আমাকে বলুন কি হয়েছে? আমি ভয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ডাক্তার বাবু বুবা কে বললেন ফুলদানির ফুলের মত তোমাকে যত্নে থাকতে হবে আর কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। তাহলে তুমি ভাল থাকবে। আমি এবার বললাম ডাক্তার বাবু মেডিসিন কি খাবে? উনি আগের ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন টাই ফলো করলেন আরও কিছু মেডিসিন অ্যাড করলেন।
আমরা বাড়ী চলে এলাম। বুবা আমাকে বলল দেখো আমার সেরকম কিছু হয় নি তবুও এই মেডিসিন কিছু দিন খাই সুস্থ হয়ে গেলে অন্য ডাক্তার আবার দেখিয়ে নেবো। এভাবেই চলতে থাকলো বেশ কিছু দিন।
বুবা ভালো নেই, এখন তো হাটাচলা করতে পারছে না তাই হসপিটাল এ অ্যাডমিট করতে হলো। কোনো ডাক্তার ই কোনো আশা দিচ্ছেন না। সবারই একি কথা কিছুই করার নেই।
আমি এখনও বিশ্বাস করি না সেরকম কিছু হয়েছে। বুবা ভালো হবে এটাই আমার মনের জোর। কোনো ডাক্তার এর জবাব ছিলো কিছু করার নেই আবার কোনও ডাক্তার বলছেন অপারেশন করতে হবে। দিন দিন টাকার অঙ্কটা বারতে চলেছে।
কিন্তু বুবা একদমই ভালো নেই। খাওয়া দাওয়ায় সব বন্ধ। নিশ্বাস নিতে পারছে না এরকম অবস্থায় ডিসিশন আমাকেই নিতে হবে। আমি নেহাতই তখনও ছেলে মানুষ, বয়স তখন 23 এর ঘরে। আমি ওর অর্ধাঙ্গিনী জন্ম জন্মান্তর এর সম্পর্ক। বুবার বাবা মা ছিলেন না তাই সব দাইত্ব আমারি ছিল। আমাকেই কঠিন সময়ের সাথে একাই চলতে হবে এটাই ভেবে আমি বুবা কে নিয়ে দক্ষিণ ভারত এর দিকে রওনা দিলাম।
এরকম শরীরের অবস্থায় বুবা কে ট্রেনে নিয়ে যাওয়া টা খুব রিস্ক ছিল তবুও আমি নিয়ে গেলাম। চলা ফেরা, খাওয়া, ঘুম সব বন্ধ। এমন কি নিশ্বাস এর কষ্ট টাও অনেক বেরে গেছে, সারা শরীরে জল এসে গেছে, পেট ফুলে গেছে! বুবার মুখে একটাই কথা আমি আর পারছি না। ট্রেন এর সবাই আমাকে বলছে, এরকম ভাবে কেউ নিয়ে যায়? কিন্তু আমি মন শক্ত করে একি কথা বলে চলেছি ঠিক হয়ে যাবে। অনেক বাধা অতিক্রম করে সাউথ এর হসপিটাল এ আমি পৌঁছতে পেরেছি।
সব রকম টেস্ট করে ফাইনালি বড়ো ডাক্তারের সামনে আমি! এটাই আমার শেষ মনের জোর। ডাক্তারের মুখের দিকে আমি চেয়ে ছিলাম, প্রতি টা সেকেন্ড আমার কাছে অনেক টেনশন এর ছিল, যা আমি প্রকাশ করার সাহস দেখাতে পারি নি। তবুও ডাক্তারের রুম এই দাড়িয়ে শেষ টুকু শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। আমার ভালো বাসার মানুষটি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে এটা আমার ভাবনায় আমি আনতে পারিনি। মনের জোর এতোটাই ছিলো আমার।
একটু কষ্ট করো বুবা, আমি আছি তোমার সাথে, লড়াই টা তোমার একার নয় আমি তোমার সাথে প্রান পন লড়ে যাবো, আমরা জিতবো ।
ডাক্তার জর্জ জোসেফ এবার ফাইনালি আমাকে জানালেন। আপনার স্বামীর রোগ টা কোনও দিনও ঠিক হওয়ার নয় কিন্তু এখনই কিছু হওয়ার মত হয় নি, এই প্রেসক্রিপশন কন্টিনিউ করে আবার এক বছর পরে আসবেন।
আমি যেনো আসার আলো দেখতে পেলাম মন কে বললাম আমি ঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। বুবা আমার সাথে অনেক দিন বাঁচবে। ও আমার জীবনের সাথী আমার প্রেম, ভালোবাসা! স্বপ্নে স্বওনে মরণে ও আমার সঙ্গী। একবছর কেনো আমি ওকে নিয়ে প্রতি বছর আসবো ডাক্তার বাবু কিন্তু আপনি আমার বুবা কে অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখুন এই বলে আবার ট্রেন এ কোলকাতার দিকে রওনা দিলাম।
15 দিন ধরে বুবার সেরকম কিছু খাওয়া হয় নি। ওষুধ খেয়ে একটু বেটার ফিল করছিল, নিজেই সিট এ বসে খাওয়ার অর্ডার করলো, আমি ওকে দুচোখ ভরে দেখছিলাম আর নিজের স্ট্রিক ডিসিশন এর উপর ভরসা রাখলাম। আমার এখন অনেক দায়িত্ব বুবা কে অনেক যত্নে রাখতে হবে, আবার বুবার বিজনেস টাও দেখতে হবে আমাকেই ফ্যামিলির সব দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি নিজেকে নিজে বললাম আমি সব পারবো বুবা, শুধু তুমি আমার পাশে থেকো।
বন্ধুরা এতো সব কিছু সহজ ছিল না, আমি যতটা সহজ করে ভাবনায় নিয়ে ছিলাম।
তাই বাকি টুকু আবারো আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। সেই সময় টুকু আপনাদের কাছে চেয়ে নিলাম। এটা আজ অতীতের গল্প শুধু মাত্র, কিন্তু আমার জীবনের সত্যি টুকু আপনাদেরকে বলতে পেরে একটু হালকা হতে পারছি। ধৈর্য ধরে আপনারা আমার লেখাটা যে পড়লেন, তার জন্য আমি আপনাদের কাছে ধন্যবাদপূর্ণ।
"কলমে রিবেকা!

3 comments:
হ্রিদয় ছুয়ে গেল
Go on with your new story
Go on with your new story
Post a Comment