ক্ষনিকের অতিথি"
"শেষ অধ্যায়"
বছর তিন কেটে গেলো , প্রতি বছর নিয়ম করে নিয়ে যেতাম দক্ষিণ ভারত। ডাক্তার জর্জ জোসেফ এর ট্রিটমেন্ট এই চলতে থাকলো, কিন্তু ভিতর থেকে সুস্থ ছিল না বুবা, আরো অনেক কিছু রোগের লক্ষণ দেখা দিলো। তাই বাড়ীর কাছের নার্সিং হোম এ অ্যাডমিট করতে হতো মাঝে মাঝে।
আমার এক কাকিমা আমাকে বললেন স্বামীর মঙ্গলের জন্য শুক্ল পক্ষে মঙ্গল বার করে মাসে একদিন মা মঙ্গল চণ্ডীর উপবাস রাখতে। কাকিমার কথা শুনে মা এর দোর ধরলাম। প্রতি মাসেই মা কে মন্দিরে গিয়ে পূজো দিতাম। একটাই নিবেদন ছিল মা এর কাছে "মাগো" আমার স্বামীর প্রান টুকু রেখো তাহলেই আমি বাকি সব টুকু সামলে নেবো। এই ভাবেই চলতে থাকলো।
বুবা কে মাঝে মাঝে হসপিটাল এ ভর্তি করতে হতো তখন কাকিমা বলতেন এক টাকার কয়েন ছুঁয়ে ঠাকুরের স্থানে রেখে দাও, আমি কাকিমার কথা শুনে প্রতি বার তাই করতে ভুলতাম না। তাতে নাকি অসুস্থ মানুষটি সুস্থ হয়ে আবার বাড়ী ফিরে আসে। আমি জানি না এসব কুসংস্কার কিনা কিন্তু ভগবানের প্রতি বিশ্বাস টুকু ছিলো। তাই আমি এসব মন থেকেই করতাম।
হটাৎ আমি খুব অসুস্থ হয়ে পরি। ডাক্তার দেখানো হল, ডাক্তার বাবু বললেন খুব তাড়াতাড়ি আমাকে অপরেশন করতে হবে নাহলে আমার প্রান এর রিস্ক আছে। তাই আমার একমাত্র ছেলের কথা ভেবে হসপিটাল এ ভর্তির দিন ঠিক করলাম।
এদিকে বুবা এত টাই অসুস্থ যে আবারো নার্সিং হোম এ নিতে হলো আমার অপারেশনের দুদিন আগে। বুবা সুস্থ না হলে আমি হসপিটালে ভর্তি হব না এটাই মা মঙ্গল চণ্ডীর কাছে নিবেদন ছিলো।
মা এর ইচ্ছেতে বুবা কে দুদিনের মধ্যেই অক্সিজেন দিয়ে তার সাথে কিছু মেডিসিন দিয়ে ছুটি দিলেন ডাক্তার বাবু।
আমার অপারেশন হলো, বাড়ী ফিরে দেখি বুবা একদম ভালো নেই। যেভাবেই হোক দক্ষিণে নিয়ে যেতেই হবে। কিন্তু আমার অপারেশন হয়েছে এই অবস্খায় যাওয়া কি ঠিক হবে আমার? তখনো আমার ব্যয়াপসির রিপোর্ট টাও আসে নি তবুও আমি মনের জোড়ে ওই অবস্খায় বেড়িয়ে পড়লাম।
কিন্তু এবার ডাক্তার বাবু আর পরের বছর যাওয়ার কথা কিছু বললেন না। বললেন আর কিছু করার নেই।
আমি তখনো ভেঙে পরি নি আমি যানি আমার মা মঙ্গল চণ্ডী আছেন উনী ঠিক রক্ষা করবেন। কিন্তু কিছু দিন ধরে আমার উপোশ টাও বন্ধ হয়ে গেছে অপারেশন এর জন্যে। তবুও মা মঙ্গল চণ্ডীর উপর আস্থা রেখে এবার কোলকাতার বড়ো হসপিটাল এ দেখালাম। ওখানকার ডাক্তার মিত্র বললেন অপারেশন করলে ঠিক হয়ে যাবে।
বুবাও অপারেশন করতে রাজি হয়ে গেলো কারণ বুবার বেচেঁ থাকার ইচ্ছে টা খুব ছিল। নিজের সন্তানের জন্য।
বুবা এখন মাঝে মাঝেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তাই বাড়ী তেই অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে ছিলাম। আমার ছোটো ছেলেটিও শিখে গিয়েছিল কেরকম করে অক্সিজেন দিতে হয় কখন কোন ওষুধ খাওয়াতে হয়। বাড়ীর পরিবেশ তখন হসপিটালের মতই।
উপোশ টা এখন পুরোপুরি বন্ধ কারণ কখনো আমি হসপিটালে আবার কখনো ডাক্তার এর কাছে।
হটাৎ একদিন বুবা জ্ঞান হারালো কিন্তু আর কিছু করেই জ্ঞান ফিরছিলো না। তাড়াতাড়ি করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে মাথায় কয়েন ছুঁয়ে মা এর নাম নিয়ে কোলকাতার বড়ো হসপিটাল এ নিয়ে গেলাম।
ইমারজেন্সি তে নিয়ে গিয়ে বলল রোগীর পালস নেই। আমি মনের জোড়ে বললাম ভাল করে দেখুন এরকম ওনার হয়। ডাক্তার মিত্র এসে বললেন এক্ষুনি অপারেশন করে টেম্পোরারি প্রেস মেকার বসাতে হবে। বুবার জ্ঞান ফিরলো আমি বুবা কে দেখে রাজি হলাম প্রেসমেকার এর জন্য।
পরের দিন বিকেলে ভিজিটিং আওয়ার্স এ বুবা বললো আমি খুব ভালো আছি মনে হয় ঠিক আগের মত সুস্থ হয়ে গেছি, কাজ কর্ম সব করতে পারবো আগের মত।
বুবার আনন্দ দেখে ফাইনালি প্রেসমেকার বসানোর বন্ড এ সাইন করলাম। অপারেশন হলো বুবা ভাল আছে।
পরের দিন ছুটির অনুমতি দিলেন ডাক্তার বাবু। কিন্তু ডাক্তার বাবু কে ধন্যবাদ জানানোর জন্য চেম্বার এ গেলাম কিন্তু উনি তখন আউট অফ স্টেশন ছিলেন, তাই ফোন এই কথা বলে বাড়ীতে অ্যাম্বুলেন্স করে নিয়ে ফিরছিলাম।
ফেরার সময় বুবা আবারো জ্ঞান হারালো কোনও রকম বাড়ীতে নিয়ে আসলাম। ডাক্তার বাবুকে ফোন করলাম, বললেন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
পরের দিন বুবা একদম ভালো নেই সারা দিন রাত্রি খুব কষ্ট পাচ্ছে ওদিকে আমার কাছে টাকা পয়সাও সেরকম ছিলো না। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। তবুও মাকে ডেকে আবারো নার্সিং হোম এ নিয়ে গেলাম। কিন্তু এবার আর পয়সা টা ছোঁয়াতে মনে পড়লো না।
নার্সিং হোম বুবা কে দেখে ফিরিয়ে দিলো আবার ছুটলাম কোলকাতার বড়ো নার্সিং হোম এ। সারা রাস্তা বুবা শুধু জল জল করতে করতে হসপিটালের গেটের সামনে গিয়ে জ্ঞান হারালো।
ইমারজেন্সি তে নিয়ে যাওয়া হলো সেখান থেকে আমাকে জানানো হলো এখন বুবার সব প্রান টুকু নিয়ে দশ পার্সেন্ট আছে। তাই বুবা কে ভেনটিলেশন এ দেয়া হলো।
আমি মনে মনে হাসলাম আর বললাম দূর এসব যতই বলো,আমি মানি না কারোর কথা। বুবার কিছুই হবে না ও আমার সাথেই বাড়ী ফিরে যাবে।
ডাক্তার বাবুর চেম্বার এর সামনে গেলাম, জানতে পেলাম উনি এখনো ফেরেননি। আমার ফোন টাও উনি আর ধরছেন না।
মাঘ মাসের ঠান্ডা তবুও আমি শীতের পোশাক ছাড়াই সাড়া রাত বসে রইলাম, কোনো কষ্ট আমার শরীরে নেই। খিদে ঘুম কিছুই আসছে না।
ভোর তখন পাঁচটা আমাকে আইসিইউ তে ডেকে পাঠানো হলো। ডাক্তার বাবু বললেন, দেখুন উনি আর ওয়ান পার্সেন্ট আছেন তাই আপনি এবার মন থেকে মেনে নিন উনি আর নেই।
আমি আবারো হেসে বললাম ডাক্তার বাবু আমি চার বছর ধরে শুনে আসছি উনি আর বেশি দিন নেই, তাই এসব কথা আমাকে নতুন করে না শুনিয়ে আপনি ওনাকে বেস্ট ট্রিটমেন্টে দিন আর সেটা যদি না পারেন তবে আমার হার্ট টা খুলে ওনাকে লাগিয়ে দিন।
ডাক্তার বাবু আমাকে হাত টা ধরে বুবার কাছে নিয়ে গেলেন। আমি গিয়ে দেখি হাজারো ইনজেকশন, বিভিন্ন মেশিন দ্বারা বুবা খুব কষ্টে শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমি এটা দেখার পর............
পরের কিছু আমার আর জানা নেই।
জ্ঞান ফিরে দেখি বুবা আমার সাথে বাড়ীতে কিন্তু বুবার গলায় মালা কে পরালো, আর আমাকে কে এই সাদা শাড়ী পড়িয়ে রাখলো।
আমি বিছানা থেকে উঠে বসলাম। তিন দিনের মাথায় আমার জ্ঞান ফিরেছে, আর জ্ঞান ফিরেই দেখি বুবা আর নেই। সব শেষ............
সবাই কে বললাম কেনো ভেন্টিলেসন থেকে ওকে বার করলে, ও তো আরো কিছু দিন বাঁচতো।
বুবার প্রতি অভিমান এ ফটো থেকে মুখ টা ঘুরিয়ে নিলাম। আমার জন্য অপেক্ষা না করেই চলে গেলে শেষ কথা টুকু তো আর বলা হল না।
সেদিন ছিল শিব রাত্রি ওদিকে ভালেন্টাইন ডে, সবাই স্বামীর দীর্ঘ আউর জন্য পূজো দিতে গেছে গঙ্গার ঘাটে, আবার ভালো বাসার দিন উপলক্ষে সবাই যখন ব্যাস্ত আমি সেই দিনে বুবার শেষ কাজ টুকু করার জন্য গঙ্গার ঘাটে ওদের সবার সাথে।
পার্থক্য শুধু এটাই ওরা স্বামীর সুস্থ থাকার মঙ্গল কামনায় গেছে আর আমি বুবার আত্মার চিরো শান্তির জন্য গেছি। সাড়ে নয় বছরের বিবাহিত জীবন সাতাশ বছর বয়সে ইতি টানলাম।
বন্ধুরা অনেক টাই আপনাদেরকে জানালাম নিজের জীবনের সত্যি কাহিনী। লেখা টা অনেক বড়ো হয়ে গেছে, আপনারা ধৈর্য্য ধরে যে শেষ টুকু পড়ছেন তার জন্য আমি আপনাদের কাছে ধন্যবাদপূর্ণ। অসহায় ভালোবাসা শুধু আমার নিজের মতই ছিলো তাতে যদি ভুল কিছু হয়ে থাকে আমাকে প্লীজ কমেন্ট করে জানাবেন।
আমি আজ ও মনের দিকে শক্ত হয়ে নতুন পথে চলেছি। কোনও একদিন আবারো নতুন পথের কথা গল্পের ভাষায় আপনাদের কে জানাবো আজ কের মত বিদায় জানিয়ে শেষ করলাম। শুভ রাত্রি। ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন।
"কলমে রিবেকা

No comments:
Post a Comment